আগামী দুই বছর বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপের অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করায় বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির এ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। সম্প্রতি আনাদোলু এজেন্সিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে বলেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ডেপুটি চিফ ইকোনমিস্ট আয়হান কোসে।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন সংশোধন করে আগের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে। চলতি বছরের জন্য প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপিত হার ২ দশমিক ৪ থেকে বাড়িয়ে ২ দশমিক ৬ শতাংশ করা হয়েছে। একই ভাবে আগামী বছরের পূর্বাভাস ২ দশমিক ৬ থেকে বাড়িয়ে ২ দশমিক ৭ শতাংশ করা হয়েছে। প্রবৃদ্ধির এ ঊর্ধ্বমুখী পরিবর্তনকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ‘সুসংবাদ’ বলে মনে করছেন আয়হান কোসে।
তিনি জানান, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির এ স্থিতিশীলতার পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করেছে। প্রথমত, বিশ্বের প্রধান তিন অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রত্যাশার চেয়ে ভালো পারফর্ম করেছে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও সহনশীল প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া শুল্কের ওঠানামা ও বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার প্রভাব প্রবৃদ্ধির ওপর আশঙ্কার চেয়ে কম পড়েছে। মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল হওয়ায় দেশগুলোর আর্থিক অবস্থাও এখন অনেক উন্নত। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এআই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ায় তা প্রবৃদ্ধির গতি বাড়াতে সহায়তা করছে।
আগামী দুই বছরে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও বিশ্ব অর্থনীতি এখনো তিনটি বড় ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন আয়হান কোসে। তার মতে, প্রথম ঝুঁকিটি হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক কাঠামোর ঘন ঘন পরিবর্তন, যা ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। দ্বিতীয় ঝুঁকি নতুন করে আর্থিক ধাক্কা বা ফাইন্যান্সিয়াল শকের আশঙ্কা এখনো রয়ে গেছে। আর তৃতীয় ও সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঝুঁকি অনেক দেশের ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা। বিশ্ব অর্থনীতিতে কোনো নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হলে অনেক দেশের পক্ষেই এ ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ঋণের সমস্যাটি বর্তমানে অত্যন্ত গুরুতর পর্যায়ে রয়েছে। উন্নত দেশগুলোর ঋণ বহন করার ক্ষমতা বেশি থাকলেও স্বল্প আয়ের দেশগুলো কভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে দ্রুত ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে। এ সংকট মোকাবেলায় আয়হান কোসে দেশগুলোকে একটি শক্তিশালী ‘মধ্যমেয়াদি রাজস্ব পরিকল্পনা’ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, এসব দেশকে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিতে হবে এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে। এছাড়া আর্থিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও আস্থার পরিবেশ বজায় রাখাও জরুরি।’
বিশ্বব্যাংক মনে করছে, বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি গত বছর থেকে কমতে শুরু করেছে এবং এ ধারা সামনেও বজায় থাকবে। মূলত জ্বালানি তেলের দাম কমে আসা এবং শ্রমবাজারে কর্মীর মজুরি বৃদ্ধির চাপ কম থাকায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে। তবে ভবিষ্যতে শ্রমবাজার নিয়ে বড় ধরনের সংকট দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। আগামী দশকে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় প্রায় ১২০ কোটি তরুণ নতুন করে শ্রমবাজারে যুক্ত হবে। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
আয়হান কোসে সতর্ক করে বলেন, ‘২৫ বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলো যেভাবে কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, তা মোটেও যথেষ্ট নয়। যদি এ ধীরগতি আগামী ১০ বছরেও বজায় থাকে, তবে বেকারত্ব এক ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এ সংকট মোকাবেলায় কেবল বিনিয়োগ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বরং তরুণদের এমনভাবে শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা উচ্চ উৎপাদনশীল খাতে কাজ করতে পারে। যদি এখনই বড় কোনো উদ্যোগ নেয়া না হয়, তবে এ বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী উৎপাদনমুখী কাজে অবদান রাখতে পারবে না, যা পুরো বিশ্বের অর্থনীতির জন্যই ঝুঁকি তৈরি করবে।’
এআইয়ের প্রভাব বিষয়ে আয়হান কোসে বলেন, ‘এটি সংক্ষিপ্ত কোনো বিষয় নয়। এটি যেমন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে, তেমনি স্বল্পমেয়াদে কিছু মানুষের কাজ কেড়েও নিতে পারে। তাই নতুন প্রজন্মকে এ প্রযুক্তির উপযোগী করে গড়ে তুলতে সরকারের নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি এবং মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমেই তরুণদের উৎপাদনশীল খাতে নিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব।’